মঙ্গলবার, ১৪ Jul ২০২৬, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন

বিশ্বের সবচেয়ে কম কর্মক্ষমতা রাজধানীবাসীর

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ঘনবসতি, কংক্রিটের ইমারত বাড়া এবং গাছপালা কমে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা বেড়েছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে রাজধানীবাসীর কর্মক্ষমতা বিশ্বের সবচেয়ে কম। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বছরে এ শহরে প্রায় পাঁচ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ (ঢাকার বাইরে থেকে আসা মানুষসহ) তাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতার চেয়ে কম কাজ করতে পারছে। একই কারণে স্বাস্থ্য সমস্যাও বাড়ছে। এতে বাড়ছে রোগবালাই ও মৃত্যুর হার।

দুটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, জার্মান রেড ক্রস ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে ঢাকায় তাপপ্রবাহের ফলে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ২৫টি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা শহরের দাবদাহ নিয়ে ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অন হিটওয়েভ ইন ঢাকা’ শীর্ষক এই গবেষণায় চিহ্নিত এসব এলাকার নাম দেওয়া হয়েছে ‘হিট আইল্যান্ড’।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর এলাকায় যদি ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জলাশয় না থাকে তবে পরিবেশে প্রভাব পড়বে। উঁচু দালান বাড়ছে, নতুন করে বিভিন্ন কারণে ঢাকামুখী হচ্ছে মানুষ। এ ছাড়া যানবাহনে লাগানো এয়ারকন্ডিশনারের গরম হাওয়া তাপমাত্রা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানুষ অনুভব করতে পারে না। তবে প্রকৃতির জন্য এটি ভয়ের। প্রকৃতি এই পরিবর্তন বুঝতে পারে বলেই বন্যা ও খরার সৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা বাড়লে রোগ-জীবাণু বাড়ে। ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়াতে পারে। এখন যে তাপমাত্রা বাড়ছে, ১০ বছর পর সেটি আরো বেড়ে গিয়ে পৃথিবীর জন্য হুমকি হতে পারে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে ২০০০ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গবেষণা চালায়। এই গবেষণায় বাড্ডা, গুলশান, কামরাঙ্গীর চর, মিরপুর, গাবতলী, গোড়ান, বাসাবো, শহীদনগর, বাবুবাজার, পোস্তগোলা, জুরাইন, হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কুর্মিটোলা, উত্তরা, কামারপাড়া, মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদীয়া হাউজিং, আদাবর, ফার্মগেট, তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া ও মহাখালীকে ‘চরম উষ্ণ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণাকালে ‘হিট আইল্যান্ড’ চিহ্নিত এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা পাওয়া গেছে ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

পর পর তিন দিন এবং বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে তবেই সেটিকে বলে তাপপ্রবাহ। থার্মোমিটারের পারদ চড়তে চড়তে যদি ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে তাহলে আবহাওয়াবিদরা তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলেন। উষ্ণতা বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেটিকে বলা হয় মাঝারি তাপপ্রবাহ। আর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।

গবেষণাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অসহনীয়  গরমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকায় তাপপ্রবাহের প্রবণতা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘হিট আইল্যান্ড’গুলোতে গড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি থেকে ৩৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। ঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় গরম তখন তাপপ্রবাহের পর্যায়ে চলে যায়।

গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহকারী পরিচালক শাহজাহান সাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস) সফটওয়্যার ব্যবহার করে ঢাকায় ‘হিট আইল্যান্ড’ বের করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, প্রতিটি বাসায়, অফিসে এসি। রুম বা ঘর ঠাণ্ডা করার জন্য লাগানো এসির গরম বাতাস যখন বাইরে যাচ্ছে তখন তো আবহাওয়া গরম হবেই। বাইরেও আবার ব্যক্তিগত গাড়ি চলছে, সেখানে গরম হাওয়া।

নগর বিশেষজ্ঞ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভাব না ফেললেও যদি বাংলাদেশ থেকে ঢাকাকে আলাদা করা হয় তবে ঢাকা প্রভাব ফেলছে। কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে ঢাকার উন্নয়নের দায় আছে। আর এই দায় তৈরি করছে ঢাকা নিজেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ ঠিক রাখার লক্ষ্যে সবুজায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েক লাখ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ রোধে রাজধানীতে যাতে কোনো লক্কড়ঝক্কড় বাস চলতে না পারে, সে বিষয়ে কাজ হচ্ছে।

এদিকে নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা টুইন সিটিজ, ইউনিভার্সিটি অব আরিজোনা ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা এক গবেষণায় বলেছেন, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে তাপমাত্রা বাড়ায় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা শহর। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসে গত সোমবার এ গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

গবেষকরা ১৯৮৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ১৩ হাজার শহরে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষকরা শহরগুলোর জনসংখ্যার পরিসংখ্যানের সঙ্গে আবহাওয়ার তথ্যের তুলনা করেছেন। ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাকে ‘চরম উষ্ণ’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন তাঁরা।

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্রুত উষ্ণতা বাড়ার কারণে মানুষ কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে, বিশ্বের এমন ২৫টি দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত। এ তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

ওই গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৮৩ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ লাখ, এখন যা বেড়ে দুই কোটি ২০ লাখের কাছাকাছি। এখানে জনসংখ্যা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত হারে (২.৭ শতাংশ) বাড়ছে। এ ছাড়া এই শহরে সারা বছরই দেশের অন্যান্য জেলা থেকে মানুষ আসা-যাওয়া করে। এই ৩২ বছরে ঢাকার মোট তাপমাত্রা যে পরিমাণে বেড়েছে, তাতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার ভূমিকা ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ মূলত দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঘটেছে। উষ্ণায়নের কারণে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশে ১৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কর্মক্ষমতা কমার ঝুঁকিতে রয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com